বিশ্বচ্যাম্পিয়নের পরিচয় শুধু ট্রফি জয়ে নয়, কঠিন মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাতেও। সেই মানসিকতারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ উপহার দিল আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অসাধারণ দৃঢ়তায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে লিওনেল মেসির দল।
আটলান্টার গর্জনময় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থেকেও হাল ছাড়েনি আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শেষ পাঁচ মিনিটে দুটি গোল করে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করে আলবিসেলেস্তেরা। এর মাধ্যমে তারা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে নিল। আগামী রোববার নিউ জার্সিতে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন।

প্রথমার্ধ: ফুটবলের চেয়ে বেশি ছিল লড়াই
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবলের চেয়ে শারীরিক লড়াই ও মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে প্রথমার্ধে দর্শকরা গোলের সুযোগের চেয়ে বেশি দেখেছেন ট্যাকল, ফাউল এবং উত্তেজনাপূর্ণ দ্বৈরথ।
প্রথম ৪৫ মিনিটে কোনো দলই লক্ষ্যে একটি শট রাখতে পারেনি। ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা উভয়েই প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখতে সফল হলেও সৃজনশীল আক্রমণ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। বিরতিতে গোলশূন্য সমতায় মাঠ ছাড়ে দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের এগিয়ে যাওয়া
বিরতির পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়। ৫৫তম মিনিটে ইংল্যান্ড প্রথম কার্যকর আক্রমণ থেকেই সাফল্য পায়। ডান প্রান্ত থেকে মর্গান রজার্সের নিখুঁত ক্রসে বক্সের ভেতর অ্যান্থনি গর্ডন দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
গোলের পর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে পিছিয়ে পড়ার পর আক্রমণের গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয় আর্জেন্টিনা।
মেসির নেতৃত্বে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন
গোল শোধে মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দুটি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। আরও কয়েকটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার নিরন্তর চাপ সামলাতে পারেনি ইংল্যান্ড।
৮৫তম মিনিটে লিওনেল মেসির নিখুঁত পাস থেকে বক্সের বাইরে দারুণ এক শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। গোলটি ম্যাচে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনে এবং শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনাকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে।
এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯০+২) আবারও জাদু দেখান মেসি। ডান দিক থেকে তাঁর অসাধারণ ক্রসে হেড করে জয়সূচক গোল করেন বদলি হিসেবে নামা লাওতারো মার্তিনেজ। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা, আর হতাশায় স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড।
কৌশলের লড়াইয়ে এগিয়ে স্কালোনির আর্জেন্টিনা
ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর কোচ টমাস টুখেল চারজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ব্যবহার করে রক্ষণ আরও শক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
আর্জেন্টিনা ধারাবাহিকভাবে দুই উইং ব্যবহার করে আক্রমণ চালায় এবং ইংল্যান্ডের রক্ষণে ফাঁক তৈরি করতে সক্ষম হয়। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো দে পলের নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডকে ধীরে ধীরে চাপে ফেলে।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা লক্ষ্যে পাঁচটি শট নেয়, যেখানে ইংল্যান্ড নিতে পারে মাত্র দুটি। বলের দখল, আক্রমণের ধারাবাহিকতা এবং সুযোগ তৈরির দিক থেকেও শেষ ৩০ মিনিটে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
মেসির আরেকটি ঐতিহাসিক রাত
গোল করতে না পারলেও ম্যাচের সেরা পারফরমার ছিলেন লিওনেল মেসি। দুই গোলেই সরাসরি অবদান রেখে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, বড় ম্যাচে তাঁর প্রভাব গোলের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
পুরো ম্যাচে তিনি ৯টি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করেন এবং দুটি অ্যাসিস্ট করেন। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপের বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর নকআউট পর্বের এক ম্যাচে ৯টি সফল ড্রিবলের সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ম্যাচ শেষে হাঁটু গেড়ে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে তাঁর আবেগঘন উদ্যাপন মুহূর্তটি দ্রুতই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
ইংল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গ
ইংল্যান্ডের জন্য এটি ছিল আরেকটি হৃদয়ভাঙা রাত। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ভেঙে যায়। পুরো ম্যাচে সংগঠিত ফুটবল খেললেও শেষ দিকে চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয় টমাস টুখেলের দল।
সামনে মহারণ
এই জয়ের ফলে ইতিহাসের তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ তৈরি হলো আর্জেন্টিনার সামনে। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান শক্তিশালী দল স্পেনও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। ফলে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফাইনালটি আধুনিক ফুটবলের দুই সেরা দলের লড়াইয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে।
বিশ্বকাপের এই সেমিফাইনাল আবারও প্রমাণ করল, শেষ বাঁশি বাজার আগে আর্জেন্টিনাকে কখনোই হারিয়ে দেওয়া যায় না। আর লিওনেল মেসি—তিনি গোল করুন বা না করুন—একটি মুহূর্তেই বদলে দিতে পারেন ম্যাচের পুরো গল্প।

