বিদায় মেসি: কান্না, অপেক্ষা আর বিশ্বজয়ের ২১ বছরের গল্প

Date:

Share post:

একজন ফুটবলারকে বিদায় বলা যায়। কিন্তু কিছু মানুষকে বিদায় বলা যায় না—কারণ তাঁরা খেলার মাঠ পেরিয়ে মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে যান।

লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সি শেষবারের মতো তুলে রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর ঠিক এমনই এক মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়েছে ফুটবল বিশ্ব। খবরটি হয়তো অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত ছিল। বয়স, সময় আর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার—সব মিলিয়ে অবসরের ইঙ্গিত আগেই ছিল। তবু ঘোষণাটি শুনলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগে।

কারণ আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে মেসির সম্পর্কটা কখনোই শুধুই ফুটবলের ছিল না। এই জার্সি পরেই তিনি একটি জাতির উচ্ছ্বাস দেখেছেন, শুনেছেন সমালোচনা, সহ্য করেছেন ব্যর্থতার দায়, কেঁদেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই মানুষগুলোর কাছ থেকেই পেয়েছেন সীমাহীন ভালোবাসা।

মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি তাঁকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে। তবে তাঁর মনে হয়, দেশের হয়ে দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

এই একটি উপলব্ধির পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ এক যাত্রা।

শুরুটা ছিল প্রত্যাশার পাহাড় নিয়ে

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আবির্ভাব। তখনই বোঝা গিয়েছিল, ছেলেটির মধ্যে সাধারণ কিছু নেই। বল পায়ে তাঁর গতি, নিয়ন্ত্রণ আর খেলার ধরন তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছিল।

কিন্তু প্রতিভার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল আরও একটি পরিচয়—ডিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি।

আর্জেন্টিনার ফুটবলে ম্যারাডোনার নাম যেখানে আবেগ, ইতিহাস ও জাতীয় গৌরবের সঙ্গে মিশে আছে, সেখানে তাঁর সঙ্গে তুলনা কোনো তরুণের জন্য সহজ ছিল না।

মেসি ক্লাবের হয়ে একের পর এক অসাধারণ পারফরম্যান্স করতেন। গোল করতেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করাতেন, অসম্ভব পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ বের করে আনতেন। অথচ জাতীয় দলের জার্সিতে একটু ব্যর্থ হলেই প্রশ্ন উঠত—বার্সেলোনার মেসি আর্জেন্টিনায় কেন দেখা যায় না?

প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ যেন তাঁর জন্য আরেকটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

২০১৪: স্বপ্নের এত কাছে গিয়েও

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠল। প্রতিপক্ষ জার্মানি। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ সামনে। মেসির কাছেও সেটি ছিল নিজেকে প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানি বিশ্বকাপ নিয়ে গেল।

মেসি পেলেন গোল্ডেন বল, কিন্তু হাতে উঠল না সেই ট্রফি, যেটার জন্য পুরো দেশ অপেক্ষা করছিল।

সেদিনের পরও প্রশ্ন থামেনি।

পরপর দুই ফাইনাল, পরপর আঘাত

২০১৫ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারল আর্জেন্টিনা। এক বছর পর ২০১৬ সালেও একই প্রতিপক্ষ, একই মঞ্চ এবং আবারও টাইব্রেকারে পরাজয়।

দ্বিতীয়বারের পর মেসি ভেঙে পড়েছিলেন।

এতটাই যে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—ক্লাব ফুটবলে সম্ভাব্য প্রায় সব সাফল্যই তখন তাঁর ঝুলিতে। ব্যক্তিগত পুরস্কারের অভাব ছিল না। কিন্তু দেশের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি না পাওয়াটাই যেন তাঁর সব অর্জনের ওপর ছায়া ফেলেছিল।

তখন হয়তো কেউ জানত না, গল্পটির সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলো এখনো বাকি।

অবশেষে ২০২১

২০২১ সালে আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল। এবারও ব্রাজিলের বিপক্ষে।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মেসিকে আর ধরে রাখতে পারেনি আবেগ।

মাঠেই বসে পড়লেন তিনি। চোখে পানি। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন।

সেই মুহূর্তে শুধু আর্জেন্টিনা একটি ট্রফি জেতেনি। মেসিও যেন বহু বছরের একটি বোঝা নামিয়ে রেখেছিলেন।

জাতীয় দলের হয়ে তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা এল। এতদিনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—‘মেসি দেশের হয়ে কিছু জেতেননি’—সেটির উত্তর তিনি মাঠেই দিয়ে দিলেন।

তবু সামনে ছিল আরও বড় কিছু।

কাতার: যে রাত বদলে দিল সবকিছু

২০২২ বিশ্বকাপে শুরুটাই হয়েছিল ধাক্কা দিয়ে। সৌদি আরবের কাছে হেরে আর্জেন্টিনা চাপে পড়ে যায়।

কিন্তু এরপর গল্প বদলাতে থাকে।

মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া—একটির পর একটি ম্যাচ পেরিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে।

মেসির বয়স তখন ৩৫। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে তিনি যেন নিজের সামর্থ্যের আরেকটি সংস্করণ দেখালেন।

শেষ বাধা ফ্রান্স।

এরপর যা ঘটল, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ফাইনাল।

আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল ২-০। ফ্রান্স ফিরে এল ২-২-এ। আবার আর্জেন্টিনা ৩-২। আবার এমবাপ্পের গোলে সমতা। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার।

এই নাটকীয়তার পর ট্রফি উঠল মেসির হাতে।

যে বিশ্বকাপ তাঁর ক্যারিয়ারে এতদিন অনুপস্থিত ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর হয়ে গেল।

মেসির হাতে শুধু বিশ্বকাপ ছিল না; ছিল বহু বছরের সমালোচনার জবাব। ২০১৪-এর হতাশা, ২০১৫ ও ২০১৬-এর ব্যর্থতা, অবসরের সিদ্ধান্ত—সবকিছু যেন সেই এক ছবির মধ্যে এসে মিলেছিল।

এরপর আর প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না

২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা জিতল আর্জেন্টিনা।

তখন মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের পাশে লেখা সাফল্যের তালিকা আর কোনো যুক্তির অপেক্ষা করছিল না।

বিশ্বকাপ। দুটি কোপা আমেরিকা। অলিম্পিক সোনা।

কিন্তু সংখ্যাগুলোই মেসির গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়।

তাঁর আসল গল্পটা হলো ফিরে আসার।

হেরে গিয়ে আবার মাঠে নামা। সমালোচনার পরও আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তোলা। কান্নার পর আবার নেতৃত্ব দেওয়া। একবার অবসর ঘোষণা করেও দেশের জন্য ফিরে আসা।

মেসি শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দিয়েছেন, কোনো কোনো সম্পর্কের কাছে পরাজয়ও মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে না।

আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ঠিক তেমন।

২০২৬: শেষ অধ্যায়

তারপর এল ২০২৬ বিশ্বকাপ।

মেসির শেষ বিশ্বকাপ। শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়ানো।

আর্জেন্টিনা আবারও ফাইনালে উঠল। প্রতিপক্ষ স্পেন।

কিন্তু এবার শেষটা হলো পরাজয়ে।

ফাইনালের পর মেসির চোখের জল ছিল অন্যরকম।

২০১৪ সালের কান্নায় ছিল অপূর্ণতার যন্ত্রণা। ২০২৬ সালের কান্নায় ছিল বিদায়ের সত্যিটা মেনে নেওয়ার কষ্ট।

তিনি জানতেন, এবার আর নতুন কোনো বিশ্বকাপ আসবে না। জাতীয় দলের হয়ে আরেকটি ফাইনাল খেলার সুযোগও থাকবে না।

আর কোনো বিশ্বকাপের আগে জাতীয় সংগীতের সময় ক্যামেরা তাঁর মুখ খুঁজবে না। গ্যালারি থেকে তাঁর নাম ধরে ওঠা সেই পরিচিত আওয়াজও আর একই অর্থ বহন করবে না।

একটি যুগের শেষ সেখানেই।

কিন্তু মেসির গল্প কি সত্যিই শেষ?

সম্ভবত না।

একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার শেষ হতে পারে। কিন্তু কিংবদন্তির গল্প শেষ হয় না।

মেসির গল্প থাকবে সেই শিশুটির মধ্যে, যে প্রথমবার আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবে। থাকবে সেই ভক্তের স্মৃতিতে, যে ২০১৪ সালে তাঁর সঙ্গে কেঁদেছিল। থাকবে ২০২১-এর কোপা জয়, ২০২২-এর বিশ্বকাপ আর ২০২৪-এর আরেকটি মহাদেশীয় শিরোপায়।

সবচেয়ে বেশি থাকবে তাঁর লড়াইয়ের গল্পে।

কারণ মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু তিনি কতগুলো ট্রফি জিতেছেন, তা নয়। বরং কতবার অসম্ভব চাপের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আবার শুরু করেছেন—সেটিই তাঁর উত্তরাধিকার।

একসময় আর্জেন্টিনার মানুষ তাঁকে প্রশ্ন করেছিল।

পরবর্তীতে সেই একই মানুষ তাঁকে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্রগুলোর একজন করে নিয়েছে।

এটাই হয়তো মেসির সবচেয়ে সুন্দর জয়।

প্রিয় লিও,

আপনাকে বিদায় বলা কঠিন।

কারণ আপনি শুধু একটি দলের অধিনায়ক ছিলেন না। আপনি ছিলেন অসংখ্য রাত জেগে ম্যাচ দেখা মানুষের আবেগের অংশ।

আপনি থাকবেন ২০০৭-এর সেই শুরুর দিনগুলোতে। থাকবেন ২০১৪-এর ব্যর্থ ফাইনালে। থাকবেন ২০১৫ ও ২০১৬-এর হতাশায়। থাকবেন ২০২১-এর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফিতে। থাকবেন ২০২২-এর বিশ্বকাপজয়ের ছবিতে। থাকবেন ২০২৪-এর কোপা আমেরিকার আনন্দে।

আর থাকবেন ২০২৬-এর সেই শেষ রাতেও—যে রাতে আর্জেন্টিনা হেরেছিল।

তবু আপনার গল্পকে পরাজয়ের গল্প বলা যাবে না।

কারণ আপনি আমাদের দেখিয়েছেন, মহান হওয়া শুধু জেতার নাম নয়। কখনো কখনো বারবার ভেঙে পড়েও নিজের ভালোবাসার জায়গাটিতে ফিরে আসাই সবচেয়ে বড় জয়।

বিদায়, লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনার জার্সি থেকে হয়তো আপনি সরে গেলেন। কিন্তু সেই জার্সির ইতিহাস থেকে আপনাকে সরানোর ক্ষমতা কারও নেই।

Related articles

জার্সি বদলেছে, সময় বদলেছে—বদলায়নি শুধু মেসির গোল

মেসির গোলের গল্পে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ নতুন মঞ্চে গেলেও পুরোনো অভ্যাসটা ঠিকই সঙ্গে নিয়ে যান...

সালমান শাহকে হারিয়ে যে সিনেমায় নায়ক হলেন ওমর সানী

সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেমে যেতে বসেছিল একটি সিনেমার পথচলা। ছবিটির বড় একটি অংশের শুটিং তখন শেষ, কিন্তু...

নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে ৪ শতাধিক বিদেশি নিখোঁজ

প্রবল বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে...

ইরান যুদ্ধের ছয় মাস: ট্রাম্পের পরিকল্পনা কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে?

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে একাধিক সতর্কবার্তা ছিল। যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গোয়েন্দা ও...