ক্ষমতার উত্থান-পতন, সাফল্য ও বিতর্ক: তিন মেয়াদে খালেদা জিয়ার আলোচিত ঘটনা

Date:

Share post:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকের এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল পথচলার নাম খালেদা জিয়া। ১৯৯১ থেকে ২০০৮—এই সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি একবারও কোনো আসনে পরাজয়ের মুখ দেখেননি। বরং বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও যেসব আসনে প্রার্থী হয়েছেন, প্রতিটিতেই জয় পেয়েছেন তিনি। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুর—দেশের নানা প্রান্তের ২৩টি আসন থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বিএনপির এই শীর্ষ নেত্রী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার জীবন যেমন ক্ষমতায় আরোহণ ও পতনের ইতিহাস, তেমনি তাতে রয়েছে কারাবাস, প্রবল রাজনৈতিক বৈরিতা এবং সিদ্ধান্তঘিরে তীব্র বিতর্ক।

সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের নায়ক

সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আশির দশকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। সেই সময় তিন দফা গ্রেপ্তারও হন তিনি। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন করেন খালেদা জিয়া।

২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ক্ষমতায় এসেই দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা থেকে দেশকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন—যা তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত।

নারী শিক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ

প্রথম মেয়াদেই শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনেন খালেদা জিয়া। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনা, উপবৃত্তি চালু এবং ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচি নারী শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তার শাসনামলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়। পরবর্তীতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়—যা গ্রামীণ নারী শিক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।

অর্থনীতিতে ভ্যাট, রাজনীতিতে বিতর্ক

বিএনপি সরকারের আমলে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কার্যকর করা হয়, যা রাজস্ব ব্যবস্থায় এক বড় পরিবর্তন আনে। ব্যবসায়ীদের আপত্তি সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে সরকারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়।

তবে প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। মাত্র ১২ দিনের মাথায় সেই সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া।

পরিবেশ রক্ষা থেকে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’

২০০১ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে পরিবেশ সংরক্ষণে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নেন খালেদা জিয়া। বিশ্বের প্রথম দিকের দেশ হিসেবে এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রশংসা পায়।

তবে একই মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে শুরু হয় সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে, যা তার সরকারের অন্যতম সমালোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে দায়মুক্তি আইন বাতিল করে হাইকোর্ট।

র‍্যাব, জঙ্গিবাদ ও একুশে আগস্ট

অপরাধ দমনে ২০০৪ সালে গঠিত হয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। শুরুতে বাহিনীটি জনপ্রিয়তা পেলেও ‘ক্রসফায়ার’ বিতর্কে পড়ে মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়ে।

এই মেয়াদেই দেশজুড়ে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভয়ংকর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। পরবর্তীতে জেএমবির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হয়।

দশ ট্রাক অস্ত্র ও দুর্নীতির কালিমা

২০০৪ সালে চট্টগ্রামে উদ্ধার হওয়া দশ ট্রাক অস্ত্র বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে এবং পরবর্তীতে আদালতে দণ্ড ও খালাস—দুটিই দেখা যায়।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টানা কয়েক বছর দুর্নীতিতে শীর্ষে অবস্থান করে—যার বড় অংশই খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত।

ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা

খালেদা জিয়া—একদিকে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী, নারী শিক্ষা ও পরিবেশ রক্ষায় অগ্রদূত; অন্যদিকে জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও মানবাধিকার বিতর্কে সমালোচিত এক শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্র। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই সাফল্য ও বিতর্ক—দুইয়েরই মিশেলে গড়া এক জটিল অধ্যায়, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে।

Related articles

রোজ সকালে মেথি ভেজানো পানি পান করলে কী হয় শরীরে?

মেথির বীজ প্রাচীনকাল থেকেই রান্না, রূপচর্চা ও ভেষজ চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত মেথি...

বাংলাদেশ সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতার বসানোর নির্দেশ দিয়েছে কলকাতার হাইকোর্ট

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অংশেই রয়েছে প্রায় ২,২১৭ কিলোমিটার সীমান্ত। এই দীর্ঘ...

১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের বিল পাস

ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে একটি বিল জাতীয় পরিষদে পাস হয়েছে।...

নিরাপত্তা ইস্যুতে অনড় বাংলাদেশ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিল আইসিসি

নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে বাংলাদেশের আপত্তি আমলে না নিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ...