টেকনাফে বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুট, গ্রেপ্তার ২

Date:

Share post:

কক্সবাজারের টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে সংঘটিত আলোচিত ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে অভিযানের পরও লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তকারীরা বলছেন, ডাকাতি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এর পেছনে আরও একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, সোমবার রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকার নুরালীপাড়ায় অভিযান চালিয়ে আকতার হোসেন ও নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে লুট হওয়া টাকা উদ্ধার এবং পলাতক অন্য সদস্যদের শনাক্তে অভিযান চালানো হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটে ২ আগস্ট দুপুরে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর কাছে। টেকনাফ থেকে কক্সবাজারগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে প্রায় ৩০ জন যাত্রী ছিলেন। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন বিকাশের তিনজন বিক্রয় প্রতিনিধি, যারা স্থানীয় গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের জন্য ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

তদন্তে জানা গেছে, তিন প্রতিনিধির কাছে মোট ৮২ লাখ টাকা ছিল। একজনের কাছে ছিল ৩৫ লাখ টাকা, আরেকজনের কাছে ২২ লাখ টাকা এবং তৃতীয়জন বহন করছিলেন ২৫ লাখ টাকা। ডাকাতরা হামলা চালিয়ে প্রথম দুই প্রতিনিধির কাছ থেকে মোট ৫৭ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। তৃতীয় প্রতিনিধির কাছে থাকা অর্থ অক্ষত থাকে।

ঘটনার আগে থেকেই বাসটিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, টেকনাফ বাসস্টেশন ছাড়ার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দীর্ঘ সময় বাসটির পিছু নেয়। অটোরিকশায় কালো বোরকা পরা এক নারী ছিলেন। কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, তিনি মোবাইল ফোনে বারবার কথা বলছিলেন এবং বাসটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর তাঁর গতিবিধির সঙ্গে ডাকাতদের হামলার সময় মিল পাওয়া যায়।

বাসটি দমদমিয়া এলাকায় পৌঁছানোর পর সড়কের ওপর গাছের গুঁড়ি ও পেরেক বসানো কাঠ ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। সামনে বাধা দেখে চালক বাস থামাতে বাধ্য হন। ঠিক তখনই পাশের পাহাড়ি এলাকা থেকে সাত থেকে আটজন মুখোশধারী অস্ত্রধারী ব্যক্তি দ্রুত নেমে এসে বাসটি ঘিরে ফেলে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আতঙ্ক ছড়াতে ডাকাতরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এরপর চারজন বাসে উঠে সরাসরি নির্দিষ্ট কয়েকজন যাত্রীর কাছে চলে যায়। এতে তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে যে, আগে থেকেই তারা জানত কারা বিপুল অঙ্কের টাকা বহন করছেন।

এক পর্যায়ে এক বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি বাধা দেন। এতে তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অপর প্রতিনিধিকেও মারধর করে তাঁর কাছে থাকা ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে নেয় ডাকাতরা। পুরো ঘটনাটি মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়।

ডাকাতরা টাকা নিয়ে দ্রুত পাশের পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যায়। একই সময়ে বাসটিকে অনুসরণ করা অটোরিকশাটিও এলাকা ত্যাগ করে। এই কারণে তদন্তকারীরা ওই নারীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

ঘটনার পর আহত দুই প্রতিনিধিকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত একজনকে পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, ডাকাত দলের সদস্যরা স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। হামলার সময় কারও মুখ ঢাকা ছিল, আবার কারও পরনে ছিল সাধারণ টি-শার্ট, গেঞ্জি ও প্যান্ট। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তারা আশপাশের এলাকার সঙ্গে পরিচিত ছিল।

পুলিশ মনে করছে, শুধু সড়কে ওৎ পেতে থাকা ডাকাতদের পক্ষে এত নিখুঁতভাবে অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না। তাই বাসের ভেতর কিংবা যাত্রাপথে কেউ তথ্য সরবরাহ করেছিলেন কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। চালক, চালকের সহকারী এবং বাসে থাকা কয়েকজন যাত্রীর গতিবিধিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে তদন্তে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই ডাকাতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তাদের মধ্যে স্থানীয় অপরাধী ছাড়াও সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার বিষয়েও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে লুট হওয়া অর্থের অবস্থান, পলাতক সহযোগীদের পরিচয় এবং পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

নগদ অর্থ পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দিনের বেলায় ব্যস্ত মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকের মতে, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো ঘটনার নেপথ্যের চক্রকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।

Related articles

৩ দিনে বদলে গেল সব, দেশ ছাড়লেন শেখ হাসিনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তাঁর দেশত্যাগের...

ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে জোট, ফিফা বর্জন ও বিকল্প টুর্নামেন্টের হুঁশিয়ারি

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে...

ক্যারিয়ারের মোড়ে নেইমার, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

সান্তোসে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, ডিসেম্বরের আগে সিদ্ধান্ত নয়: নেইমার সান্তোসের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে এখনও কয়েক মাস বাকি। তাই...

আগের নিয়মেই একাদশে ভর্তি, থাকছে না ভর্তি পরীক্ষা

আসন্ন শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিকের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোনো বড় পরিবর্তন আসছে না। সরকার পরিবর্তনের পর ভর্তি পরীক্ষা চালুর...