রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তীব্র গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নিত্যদিনের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অনেক এলাকায় চুলায় গ্যাসের দেখা মিলছে না। কোথাও কোথাও অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গৃহিণীরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সময়মতো খাবার প্রস্তুত করতে পারছেন না।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, সবুজবাগ, বাসাবো, শ্যামলী, খিলগাঁও, আজিমপুর, পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি ও গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। বাসিন্দারা জানান, দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় আগুন জ্বলে না। অনেক সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে বারবার আগুন নিভে যায়। এতে রান্নার কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যদের নির্ধারিত সময়ে খাবার পরিবেশন করা সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী পরিবারগুলো। সকালবেলা অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগে নাশতা কিংবা দুপুরের খাবার প্রস্তুত করতে না পেরে অনেকেই বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার আবার গভীর রাত কিংবা ভোরবেলায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন রান্না করে খাবার সংরক্ষণ করছেন।
মিরপুরের বাসিন্দা তন্নী আক্তার বলেন, “গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছি। এতে বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাচ্ছে, আবার সব ধরনের রান্নাও করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন কখন গ্যাস আসবে সেই অপেক্ষায় থাকতে হয়। এখন এটি আমাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।”
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা জানান, “সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর আগে নাশতা তৈরি করতে পারি না। অনেক সময় শুধু বিস্কুট বা শুকনো খাবার দিয়েই তাদের পাঠাতে হচ্ছে। রাত ১২টার পরে যদি গ্যাস আসে, তখন রান্না করতে হয়।”
গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর অসংখ্য পরিবার বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, আবার কেউ এলপিজি সিলিন্ডার কিনে রান্নার ব্যবস্থা করছেন। তবে এই বিকল্প ব্যবস্থাও অনেকের জন্য ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি, এলপিজির অতিরিক্ত খরচ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার চাপ সাধারণ মানুষের সংসার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের গ্যাস খাত ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। এর সঙ্গে যদি এলএনজি সরবরাহে কোনো কারিগরি সমস্যা যুক্ত হয়, তাহলে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
গ্যাসের স্বল্পচাপ শুধু আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং সিএনজি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কোনো কারণে আমদানিকৃত গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব দেশের পুরো গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় পড়ে।
এদিকে রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানায়, কারিগরি ত্রুটির কারণে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলো থেকে রি-গ্যাসিফায়েড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি কমে গেছে। ফলে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাভুক্ত আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য সব শ্রেণির গ্রাহককে তীব্র গ্যাসের স্বল্পচাপের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে সাময়িক এই দুর্ভোগের জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।
তবে কবে নাগাদ কারিগরি সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে এবং স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হবে—এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন লাখো গ্রাহক।
এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও জ্বালানি বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন। তাদের দাবি, সংকট দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে, শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত কারিগরি ত্রুটি সমাধান করে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

