প্রকল্পের পর প্রকল্প, তবু থামেনি যমুনার ভাঙন

Date:

Share post:

যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন ঠেকাতে গত দুই দশকে বগুড়া অংশে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। স্পার, গ্রোয়েন, হার্ডপয়েন্ট, ক্রসবার, ফিশপাস, নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ পুনর্বাসনের মতো নানা ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, বিপুল এই সরকারি বিনিয়োগের পরও যমুনার আগ্রাসন কমেনি। বরং প্রতি বর্ষাতেই নতুন নতুন জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, উজাড় হচ্ছে কৃষিজমি, ভেঙে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক। এমন বাস্তবতায় এবার প্রায় ২২০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘ ১৯ বছরে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা কতটুকু ছিল? কেন এখনো ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলাই প্রধান ভরসা? আর কেনই বা যমুনার প্রায় অর্ধেক নদীতীর এখনো স্থায়ী সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে?

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যমুনা নদীর ডান তীর রক্ষায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি স্পার, একটি গ্রোয়েন, দুটি হার্ডপয়েন্ট, ছয়টি ক্রসবার এবং একটি ফিশপাস নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতীর সংরক্ষণ, বাঁধ উন্নয়ন, পুনর্বাসন এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

২০০২ সালে সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজার রক্ষায় ৫৫৮ মিটার দীর্ঘ একটি স্পার নির্মাণ করা হয়। একই বছরে নিজবলাইল বাজারের সামনেও আরেকটি স্পার নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে ধুনট থেকে সারিয়াকান্দি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নদীতীর সংরক্ষণের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ২০০৬ সালে কালিতলা গ্রোয়েন থেকে তিতপরল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এবং দেবডাঙা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে রৌহাদহ থেকে মথুরাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ শেষ হয়।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চলতি বর্ষায় ধুনটের শহরাবাড়ী ও ভান্ডারবাড়ী, সারিয়াকান্দির কামালপুর এবং সোনাতলার পাকুল্ল্যা এলাকায় নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক দিনের মধ্যেই শত শত মিটার নদীতীর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বহু পরিবার রাতারাতি বসতভিটা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কাঁচা-পাকা সড়ক এবং স্থানীয় বাজার।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শুধু ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ী এলাকাতেই মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে প্রায় ২০০ মিটার নদীতীর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার অন্তত ১০টি গ্রাম নতুন করে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন শুরু হলেই জরুরি কাজের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে জিওব্যাগ ফেলা হয়। কিন্তু বর্ষা শেষে এসব জিওব্যাগের বড় অংশ নদীর স্রোতে তলিয়ে যায় অথবা স্থানচ্যুত হয়। ফলে পরবর্তী বর্ষায় একই এলাকায় আবারও নতুন করে জরুরি প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়।

সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের মুন্সি বলেন, “নদী ভাঙলেই জরুরি কাজের নামে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই আবার একই জায়গায় ভাঙন শুরু হয়। তাহলে আগের কাজের ফল কোথায়?”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বগুড়া অংশে যমুনা নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ১৯ কিলোমিটার নদীতীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। বাকি প্রায় ২৬ কিলোমিটার এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ফলে ধুনট, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্রতিবছর নদীভাঙনের হুমকির মুখে থাকে।

এই বাস্তবতায় নতুন করে প্রায় ২২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার নতুন নদীতীর সংরক্ষণ, প্রায় দুই কিলোমিটার পুরোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোর পুনর্বাসন ও মেরামত, ধুনটের শহরাবাড়ী ও বানিয়াজান স্পারের পুনর্বাসন, প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার নদী ড্রেজিং এবং বিদ্যমান বাঁধের সংস্কার ও পুনর্বাসনের কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গণশুনানি, জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন এবং সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতোমধ্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে যমুনার ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। কারণ যমুনা বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ব্রেইডেড (Braided) নদী। এ ধরনের নদীতে মূল স্রোত বারবার অবস্থান পরিবর্তন করে। ফলে একটি স্থানে স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ করলে কয়েক বছরের মধ্যেই নদীর চাপ অন্য এলাকায় গিয়ে পড়ে এবং সেখানে নতুন ভাঙন শুরু হয়।

নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ফজলুল হক বলেন, “শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যমুনা অত্যন্ত গতিশীল একটি নদী। এর প্রবাহ, চর গঠন, ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় এনে দীর্ঘমেয়াদি নদী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করলে নদীর চাপ অন্য স্থানে গিয়ে পড়ে।”

নদী গবেষক নিজামুল হকও একই মত প্রকাশ করে বলেন, পরিকল্পিত নদী প্রশিক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণেও অনেক এলাকায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে, যা ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি।

সারিয়াকান্দির বাসিন্দা কাদের মোল্লা বলেন, “আমরা কেউ দুইবার, কেউ তিনবার, আবার কেউ চারবার পর্যন্ত বাড়িঘর সরিয়েছি। নদী শুধু জমি নেয়নি, আমাদের জীবনটাই বদলে দিয়েছে।”

এ বিষয়ে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধুনট, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা স্থায়ী সুরক্ষা পাবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখেই নতুন নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দুই দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যখন যমুনার ২৬ কিলোমিটার নদীতীর অরক্ষিত রয়ে গেছে এবং প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, তখন আরও ২২০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প কতটা কার্যকর হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; বরং পুরো যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে সমন্বিত নদী প্রশিক্ষণ, প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং, পরিবেশগত মূল্যায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের একমাত্র কার্যকর পথ। অন্যথায় প্রতিবছর নতুন প্রকল্প, নতুন ব্যয় এবং নদীতীরের মানুষের একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

Related articles

পর্দা লঙ্ঘনের অভিযোগে এমপি গাজী নজরুল বহিষ্কার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল...

সংসদ ঘেরাওয়ের চেষ্টা, দিল্লিতে নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সোমবার পরিণত হয় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা...

মেসির জোড়া অ্যাসিস্টে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা

বিশ্বচ্যাম্পিয়নের পরিচয় শুধু ট্রফি জয়ে নয়, কঠিন মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাতেও। সেই মানসিকতারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ উপহার দিল...

বৃষ্টির ৩৩ ঘণ্টা পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা

গত শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।...