যুদ্ধের ফাঁদে ট্রাম্প, মূল্য দিচ্ছে পুরো বিশ্ব

Date:

Share post:

মাত্র এক মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমিত করা, যুদ্ধের ইতি টানার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু সেই আশাবাদ এখন অনেকটাই ম্লান। গত কয়েক দিনে দুই দেশ একে অপরের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বাস্তবে চুক্তির পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে এত বেশি হুমকি, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সামরিক হামলা হয়েছে যে সংঘাতটি যেন একাধিকবার শুরু ও শেষ হয়েছে বলে মনে হয়। কখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার দাবি, কখনো যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার সতর্কবার্তা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একদিকে ইরানকে কখনো সাহসী প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, আবার কখনো তাদের নেতৃত্বকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে তেহরান যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী নয়, আবার কখনো দাবি করা হচ্ছে তারাই শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে। একইভাবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসছে—কখনো তা পুরোপুরি সচল, কখনো বন্ধ, আবার কখনো আংশিক চালু থাকার খবর মিলছে।

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সংঘাতের অবসান ঘটবে। কিন্তু যুদ্ধ এখন ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে। পাল্টা জবাবে ইরানও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নতুন করে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সংঘাত এখন শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইরান উপলব্ধি করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কৌশলগত প্রভাব একটি বড় শক্তি। ফলে এই সুবিধা ছেড়ে দ্রুত সমঝোতায় যাওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে ট্রাম্পও এমন অবস্থায় যুদ্ধ থামালে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল দেখানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।

পূর্ণমাত্রার স্থলযুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিও কম নয়। এমন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং পেন্টাগনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমালোচনা বাড়িয়েছে।

যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পেন্টাগন আরও ৬৭ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বাজেট চেয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এত বড় ব্যয় দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ খাতে চাপ সৃষ্টি করবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। ইরানে বেসামরিক নাগরিক, শিশু এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করায় বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

এমন অস্থিরতার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, বিভিন্ন দেশ জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবে সমালোচকদের মতে, চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই যুক্তি অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল ভর্তুকি বা মূল্য নিয়ন্ত্রণের মতো নীতি দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। কারণ, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো সরাসরি সংঘাতের প্রভাবে পড়েছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার পথ যেমন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি দীর্ঘায়িত সংঘাতের অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্যও বহন করতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকে।

Related articles

মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিল বিএনপি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। আজ দুপুরে সচিবালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ...

বিয়ের আশায় লাখ লাখ ইউয়ান খুইয়ে চীনের পুরুষেরা

বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগ থেকেই চীনের ৩৭ বছর বয়সী ওয়াং ঝুয়াং জীবনসঙ্গীর সন্ধান শুরু করেছিলেন। দীর্ঘদিন চেষ্টা...

ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনায় কয়েক দশকে বিভিন্ন হামলা ও সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চান...

এসএসসি ও সমমানের ফলে পাসের হার ও জিপিএ–৫ কমেছে

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে আজ সোমবার (১০ আগস্ট)। এবারের ফলে ৯টি সাধারণ...