মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা বাড়ায় বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা পেরিয়ে যায়। জুলাইয়ের পর এটাই প্রথমবার, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এই পর্যায়ে উঠল।
দিনের লেনদেনে ব্রেন্টের মূল্য প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণেই বাজারে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যদিও পরে দাম কিছুটা কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে একাধিক সামরিক ঘটনার কারণে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানে হামলার চেষ্টা করেছে। এর পর ইরানের কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানায় ওয়াশিংটন। এর আগে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় সৌদি আরবের চারটি শহর। হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি তেল স্থাপনাতেও আগুন লাগে।
বাজারের সাম্প্রতিক গতিপথ দেখলে সংকটের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়। আগস্টের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তেলের দাম প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে। ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়া এবং নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথ। সেখানে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগেও সংঘাতের প্রভাব সরাসরি তেলের দামে দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যারেলপ্রতি তেলের মূল্য ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এপ্রিল মাসে সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন দেখা যায়। ওই সময় তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে এবং দাম কমতে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয় জ্বালানি তেলের বাজার।
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, গ্যাসের বাজারেও চাপ বাড়ছে। চলতি মাসে যুক্তরাজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন থেকে শুরু করে শিল্প ও পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দেশটির কিছু অর্থনীতিবিদ এখন ধারণা করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফেড অন্তত একবার সুদের হার বাড়াতে পারে।
সুদের হার বাড়লে অর্থনীতিতে তার আরেকটি পরোক্ষ প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে। ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণত বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয় কমে যায়। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হতে পারে এবং জ্বালানির চাহিদাও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
অন্যদিকে, উচ্চ সুদের হার মার্কিন ডলারকে তুলনামূলক শক্তিশালী করতে পারে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই শক্তিশালী ডলার তেল আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু সামরিক বা আঞ্চলিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। তেলের সরবরাহ, গ্যাসের মূল্য, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

