হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভূমিকা নিয়ে বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। তবে নতুন এক গবেষণা দেখিয়েছে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়—এভারেস্টের মতো জনপ্রিয় পর্বতারোহণ এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও হিমবাহ গলার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও কাদাপানির আকস্মিক বন্যা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটায়। এতে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং এখনো পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই ঘটনা হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ ও হিমবাহের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নতুন গবেষণায় বিশেষভাবে এভারেস্টের খুম্বু হিমবাহের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নেপালের অংশে অবস্থিত এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পটি এই হিমবাহের ওপরেই গড়ে ওঠে। পর্বতারোহণের মৌসুমে সেখানে হাজারো পর্বতারোহী, গাইড ও সহায়ক কর্মী অবস্থান করেন। ফলে সাময়িকভাবে জায়গাটি ব্যস্ত এক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে মাত্র ৫০ দিনের মধ্যে বেজ ক্যাম্পের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি তাঁবুতে রান্না, উষ্ণতা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এ সময়ে ৮২৪টি এলপিজি সিলিন্ডার, ১৮ হাজার ৯৩৫ লিটার কেরোসিন এবং ৫ হাজার ১৩০ লিটার পেট্রল খরচ হয়েছে।
এই জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে তাপ তৈরি হয়, তার সঙ্গে মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া মূত্রের তাপও গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার ১৭৪ মেগাজুল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, এই শক্তি প্রায় ২ হাজার ৪৯২ টন বরফ ও তুষার গলানোর মতো তাপ সরবরাহ করতে পারে। অনিশ্চয়তার সীমা বিবেচনায় সম্ভাব্য পরিমাণ ১ হাজার ৯৬৪ থেকে ৩ হাজার ২০ টনের মধ্যে হতে পারে।
এর মধ্যে মানুষের মূত্রও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। উচ্চ altitude-এ পানিশূন্যতা এড়াতে পর্বতারোহী ও গাইডরা বেশি পানি পান করেন। ফলে বেজ ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার লিটার মূত্র জমা হয়। কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করে নিচে নিয়ে যাওয়া হলেও বিপুল পরিমাণ মূত্র সরাসরি হিমবাহের ওপর ফেলে দেওয়া হয়।
গবেষকদের হিসাবে, শুধু এই মূত্রের তাপের কারণেই একটি পর্বতারোহণ মৌসুমে প্রায় ১৫৪ টন বরফ গলে যেতে পারে। অর্থাৎ মানুষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বিষয়ও হিমবাহের স্থানীয় পরিবেশে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল পরিচালনা করেছে এবং প্রতিবেদনটি ‘রিজিওনাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা পরিবর্তনের চিত্রও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পের আশপাশের এলাকায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে। খুম্বু হিমবাহের সংশ্লিষ্ট এলাকায় রেকর্ড করা তাপমাত্রা বৃদ্ধির তুলনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ।
তবে গবেষণায় মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাবের পুরো চিত্র উঠে আসেনি। হেলিকপ্টার চলাচল, পর্বতারোহীদের শরীরের তাপ কিংবা মালপত্র বহনে ব্যবহৃত ইয়াক থেকে উৎপন্ন তাপের হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে বাস্তব প্রভাব গবেষণায় পাওয়া হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
গবেষকদের বক্তব্য, এভারেস্ট অঞ্চলের হিমবাহ গলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এখনো জলবায়ু পরিবর্তন। কিন্তু একই সঙ্গে দ্রুত সংকুচিত হতে থাকা একটি হিমবাহের ওপর প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষকে জড়ো করার বিষয়টিও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগতভাবে টেকসই নয়।
এভারেস্টের এই চিত্র তাই শুধু একটি পর্বত বা একটি হিমবাহের সংকট নয়; বরং উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে মানুষের কর্মকাণ্ড কীভাবে স্থানীয় পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

