যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের মাঠে পলিনেট হাউসে সবজির চারার পরিচর্যা করছেন বিল্লাল হোসেন।
বিস্তীর্ণ মাঠের এক কোণে সাদা পলিথিনে মোড়ানো একটি উঁচু ঘর চোখে পড়ে। লোহার পাইপ ও অ্যাঙ্গেলের তৈরি এই ঘরটির ছাউনিও পলিথিনে ঢাকা। ভেতরে সারি সারি মাটির বেড, প্রতিটি বেডে সবুজে ভরপুর সবজির চারা। সব গাছই তরতরিয়ে বাড়ছে।ঘরটির নাম ‘পলিনেট হাউস’। লোহার কাঠামো, পলি শিট ও জাল দিয়ে তৈরি এই ঘরে সারা বছরই চারা উৎপাদন করা যায়—শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা, যেকোনো ঋতুতে।যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের মাঠে এমন একটি পলিনেট হাউস গড়ে তুলেছেন ৩৫ বছর বয়সী যুবক বিল্লাল হোসেন। মানসম্পন্ন চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। কৃষকদের কাছে পেয়েছেন আস্থা ও প্রশংসা। নিজে যেমন হয়েছেন স্বাবলম্বী, তেমনি কয়েকজন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছেন।

এই পলিনেট হাউসে প্রতি বছর প্রায় ১২ লাখ টাকার চারা উৎপাদন করেন বিল্লাল হোসেন। এর মধ্যে লাভ থাকে প্রায় ৭ লাখ টাকা। এছাড়া মাঠে অতিরিক্ত চারা উৎপাদন করে তাঁর মোট বার্ষিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ টাকায়। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর নিট লাভ হয় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো।কৃষি বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, পলিনেট হাউস মূলত পলি শিট দিয়ে মোড়ানো একটি বিশেষ কৃষিঘর। এটি লোহার পাইপ ও অ্যাঙ্গেলের কাঠামো দিয়ে তৈরি করা হয়। ঘরের চারপাশ মাটি থেকে তিন ফুট উচ্চতায় পলিথিন দিয়ে ঘেরা থাকে, আর মাঝখানে ১০ ফুট ফাঁকা জায়গা রেখে বসানো হয় নেট, যেটি ওপরে ওঠানো বা নিচে নামানো যায়। এই নেট ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং চারাগুলিকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।ঘরের ছাদে থাকে পুরু পলিথিন, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি কমিয়ে দেয়। ভেতরে ব্যবহৃত হয় কালো শেড নেট, যা সূর্যের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। ফলে ঘরের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা সারা বছর চারা উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।
এছাড়া এখানে ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যাতে সরাসরি চারার গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পৌঁছে যায়। এতে পানি সাশ্রয় হয় এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও কমে যায়। মাঠের তুলনায় এখানে কীটনাশকের প্রয়োজনও হয় না।যশোর শহর থেকে মাগুরা মহাসড়ক ধরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার এগোলেই ভাটার আমতলা। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা গ্রামের সড়ক পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় মির্জাপুর মাঠে। দূর থেকেই চোখে পড়ে বিশাল এক পলিনেট হাউস—যেটি গড়ে তুলেছেন বিল্লাল হোসেন। ২০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এই আধুনিক চারা উৎপাদন কেন্দ্র এখন এলাকায় এক বিশেষ চেনামুখ।ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় সারি সারি মাটির শয্যা। মাঝে নালা করা। কিছু শয্যায় প্লাস্টিক ট্রে ও কাপে চারা রাখা হয়েছে। নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া ও কেঁচো সার মিশিয়ে কোকোপিট পদ্ধতিতে বীজ বপন করা হয়। এতে মাটি লাগে না, শিকড়ও অক্ষত থাকে।
বিল্লাল বর্তমানে ১৩ প্রজাতির চারা উৎপাদন করেন—টমেটো, বেগুন, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, লাউ, চিচিঙ্গা, বরবটি, ধুন্দুল, পেঁয়াজ, শীতকালীন শিম ও ব্রকলি। প্রথমে তিন প্রজাতি দিয়ে শুরু করেছিলেন। এখন তাঁর নার্সারির নাম হয়েছে ‘বিল্লাল নার্সারি’।

