ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) মধ্যে টানাপোড়েন ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে বাংলাদেশকে পয়েন্ট হারানোর ঝুঁকি নিতে হতে পারে—এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে আইসিসি।
তবে বিসিবি এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছে, আইসিসির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ‘আলটিমেটাম’ বা চূড়ান্ত শর্ত দেওয়া হয়নি।

কী বলছে ক্রিকইনফো
ইএসপিএন ক্রিকইনফোর তথ্যমতে, মঙ্গলবার এক ভার্চুয়াল বৈঠকের পর আইসিসি বাংলাদেশকে জানিয়ে দেয়—নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারতের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ তারা গ্রহণ করবে না। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতেই খেলতে হবে বাংলাদেশকে; অন্যথায় টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিসিবির ব্যাখ্যা
বুধবার এক বিবৃতিতে বিসিবি জানায়, আইসিসির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে এবং সেখানে কোনো ধরনের চাপ বা হুমকির বিষয় ছিল না। বরং আইসিসি বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, টুর্নামেন্টের বিস্তারিত নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিসিবির উত্থাপিত উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। জাতীয় দলের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও খেলোয়াড়দের কল্যাণই বিসিবির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলেও জানানো হয়।

পটভূমি: মোস্তাফিজ বিতর্ক
এই উত্তেজনার সূত্রপাত গত ডিসেম্বরে, যখন আইপিএল নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয়। নিলামের পরপরই ভারতের কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোস্তাফিজকে ঘিরে বিতর্ক ছড়ায়, এমনকি তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়। এর জেরে গত ৩ জানুয়ারি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই কেকেআরকে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। একই দিন কেকেআরও বিষয়টি নিশ্চিত করে।
বিসিবির প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর বিসিবি একাধিক বোর্ড সভা করে এবং আইসিসিকে চিঠি দিয়ে জানায়, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ দল ভারতে খেলতে চায় না। পাশাপাশি ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়।
এদিকে বিসিবি বিসিসিআইকেও চিঠি পাঠিয়ে জানতে চেয়েছে—নিলামের আগে ছাড়পত্র দেওয়ার পর হঠাৎ করে কেন মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়া হলো।
বাড়ছে কূটনৈতিক উত্তাপ
ঘটনার রেশ গিয়ে পড়েছে ক্রিকেট কূটনীতিতেও। বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে আইপিএল সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ভারতের কংগ্রেস এমপি শশী ঠারুর ও সাবেক বিসিসিআই প্রশাসক রামচন্দ্র গুহ এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশেও অনেকে মনে করছেন, বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সিদ্ধান্ত।
বিশ্লেষকদের মত
ভারতের ক্রীড়া বিশ্লেষক বোরিয়া মজুমদার মনে করেন, নিরাপত্তা ইস্যু আসলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। তার প্রশ্ন—যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকত, তাহলে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার আগ পর্যন্ত কেন কোনো উদ্বেগ ছিল না?
বাংলাদেশি বিশ্লেষকরাও আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সামনে কী?
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর এক মাসেরও কম সময় বাকি। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো খেলবে কলকাতা ও মুম্বাইয়ে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে কি না, নাকি আইসিসি কোনো সমঝোতার পথে হাঁটবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

