১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে তিন গোলে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টিনার

Date:

Share post:

বিশ্ব ফুটবলে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, বরং লড়াই, বিশ্বাস এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তার জন্য বছরের পর বছর স্মরণীয় হয়ে থাকে। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার এই রোমাঞ্চকর লড়াইটিও ঠিক তেমনই একটি অধ্যায়। ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত যে দলটি বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল, শেষ বাঁশি বাজার আগেই সেই দলই ইতিহাসের পাতায় লিখে ফেলল এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প। মাত্র ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে তিনটি গোল করে ২-০ ব্যবধান থেকে ৩-২ জয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

ম্যাচের শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে মিসর। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই ছিল তাদের দারুণ শৃঙ্খলা। ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে ভেসে আসা বলকে দুর্দান্ত হেডে জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন ইয়াসের ইব্রাহিম। গোল হজমের পর আর্জেন্টিনা দ্রুত ম্যাচে ফিরতে চেষ্টা করলেও ভাগ্য যেন সেদিন তাদের বিপক্ষেই ছিল। কখনো শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে, কখনো মিসরের গোলরক্ষক অসাধারণ সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। প্রথমার্ধ শেষ হয় মিসরের ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে।

বিরতির পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে মিসর। ৫৮ মিনিটে জিকো বল জালে পাঠালেও ভিএআরের সিদ্ধান্তে সেটি বাতিল হয়। তবে সেই হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬৭ মিনিটে মোহাম্মদ সালাহর গড়ে দেওয়া আক্রমণ থেকে এবার আর ভুল করেননি জিকো। নিখুঁত ফিনিশে ব্যবধান বাড়িয়ে করেন ২-০। তখন স্টেডিয়ামজুড়ে উৎসবে মেতে ওঠেন মিসরের সমর্থকরা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মুখে স্পষ্ট হতাশার ছাপ। ম্যাচের বাকি সময় দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের যাত্রা বুঝি এখানেই শেষ।

কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো—শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো ফল নিশ্চিত নয়। আর সেই সত্যটিই আবারও প্রমাণ করল আর্জেন্টিনা।

৭৯ মিনিটে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ডান প্রান্ত থেকে তাঁর নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ব্যবধান কমান ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। গোলটি শুধু স্কোরলাইনই বদলায়নি, পুরো ম্যাচের মানসিক চিত্রও পাল্টে দেয়। নতুন উদ্যমে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা, আর চাপে পড়তে শুরু করে এতক্ষণ আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলা মিসর।

প্রথম গোলের মাত্র কয়েক মিনিট পরই আসে সমতা। গনসালো মন্তিয়েলের পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজের পরিচিত বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করেন লিওনেল মেসি। বল পোস্টে লেগে জালে জড়িয়ে পড়তেই গ্যালারিতে শুরু হয় নতুন উন্মাদনা। ২-০ থেকে স্কোর দাঁড়ায় ২-২। ম্যাচ তখন সম্পূর্ণ নতুন করে শুরু হয়েছে যেন।

তবে নাটকের শেষ দৃশ্য তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ে দ্রুতগতির এক পাল্টা আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজের দীর্ঘ পাস ধরে এগিয়ে যান লাওতারো মার্তিনেজ। ডান দিক থেকে তাঁর নিখুঁত ক্রসে বক্সে উঠে এসে শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠান এনজো ফার্নান্দেজ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় মিসরের সমর্থকরা, আর আনন্দে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা শিবির। ২-০ পিছিয়ে থাকা দলটি অবিশ্বাস্যভাবে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগে ভেসে যায় পুরো আর্জেন্টিনা দল। খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস, কোচিং স্টাফের উদযাপন এবং সমর্থকদের আনন্দ—সব মিলিয়ে স্টেডিয়াম যেন পরিণত হয় এক উৎসবমুখর মঞ্চে। এই জয় ছিল শুধু তিনটি পয়েন্ট কিংবা পরের রাউন্ডে ওঠার লড়াই নয়; এটি ছিল বিশ্বাস, ধৈর্য এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।

ফুটবলের ইতিহাসে অসংখ্য প্রত্যাবর্তনের গল্প রয়েছে। তবে মাত্র ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে তিনটি গোল করে নিশ্চিত পরাজয়কে অবিশ্বাস্য জয়ে রূপ দেওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করল, বড় দলের আসল পরিচয় শুধু প্রতিভায় নয়, কঠিন মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তিতেও।

৭৯ মিনিট পর্যন্ত যে ম্যাচে মিসরের জয় প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল, শেষ বাঁশি বাজার সময় সেই ম্যাচই হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের এক মহাকাব্য—যা ফুটবলপ্রেমীরা দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করবে।

Related articles

শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলে পর্তুগালকে বিদায়, কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন

মেরিনোর ৯১তম মিনিটের জাদুতে আইবেরিয়ান ডার্বি জিতে শেষ আটে লা রোজা, বিশ্বকাপে রোনালদোর অধ্যায় কি তবে শেষ? ফিফা বিশ্বকাপ...

হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে বিদায় প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে

গোল বাতিল হওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্রাজিল। দশম মিনিটে ম্যাথিউস কুনহাকে পেনাল্টি বক্সের...

ঘরে ঘরে মাথা, চোখ ও ঘাড়ের ব্যথা—কীসের ইঙ্গিত

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে চাপ অনুভব করা এবং ঘাড়ে ব্যথার মতো...

নিজেদের ভুলেই মেসির জাদু, দাবি পেতকোভিচ

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-০ গোলে পরাজয়ের পর দলের ভুলকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন আলজেরিয়ার প্রধান প্রশিক্ষক...