এক সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মানেই যাত্রী ভোগান্তি—হয়রানি, অব্যবস্থাপনা, লাগেজ চুরি আর অসহায় প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আগের তুলনায় বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি কমেছে, শৃঙ্খলা ফিরছে, আর সেবার মানে এসেছে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের পেছনে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায়—তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম আবু নওশাদ।
বিমানবন্দরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যেন নড়েচড়ে বসেছে পুরো ব্যবস্থা। নির্ধারিত দায়িত্ব সময়ে তিনি কোনো অফিসে বসে থাকেন না—চষে বেড়ান পুরো বিমানবন্দর। কোথাও অনিয়ম, অতিরিক্ত দাম আদায়, যাত্রী হয়রানি কিংবা বিশৃঙ্খলা দেখলেই তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেন। ফলে ভোগান্তি কমেছে, বেড়েছে যাত্রীদের আস্থা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকশন, যাত্রীদের প্রশংসা
বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা নিশ্চিতে নেওয়া তার অভিযানগুলোর ভিডিও ও ছবি নিয়মিতই প্রকাশ করেন তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এসব ভিডিওতে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হচ্ছে। দেশ-বিদেশে থাকা প্রবাসী যাত্রীরা তার এই কার্যক্রমকে দেখছেন অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে। অনেকেই তাকে ভালোবেসে ডাকছেন—‘ফাটাকেস্ট ম্যাজিস্ট্রেট’।
তবে কে এম আবু নওশাদ নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, বিমানবন্দরে তিনি একা নন। তার সঙ্গে আরও সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বাংলাদেশ বিমানসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও যাত্রীসেবা নিশ্চিতে কাজ করছে। ফেসবুকে মূলত তার কার্যক্রম বেশি প্রচার হওয়ায় অনেকেই ভুলভাবে ভাবছেন, সব কিছু তিনিই একা সামলাচ্ছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ধারাবাহিক অভিযান
গত বছরের নভেম্বরের শুরুতে শাহজালাল বিমানবন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগ দেন কে এম আবু নওশাদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় একের পর এক অভিযান।
- ৫ নভেম্বর: অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রির দায়ে এক দোকানিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা।
- একই দিন, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বিশৃঙ্খলা করার অপরাধে একজনকে ৩ মাসের কারাদণ্ড।
- পকেটমারকে হাতেনাতে ধরে ১ মাসের কারাদণ্ড।
- পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিরুদ্ধে নিয়মিত জরিমানা।
- ৮ নভেম্বর: ভিড়ের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও ইভটিজিংয়ের দায়ে একজনকে ৬ মাসের কারাদণ্ড।
- ২০ নভেম্বর: বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সচেতনতামূলক ব্যানার স্থাপন।
- ২৫ নভেম্বর: লাগেজ চুরির ঘটনায় একজনকে ১ বছরের কারাদণ্ড, উদ্ধার করা হয় চুরি হওয়া লাগেজ।
৫ মিনিটেই অভিযানে হাজির
২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় এক যাত্রী ফোন করে জানান, বিমানবন্দরের নিচে একটি দোকানে ৩০ টাকার জুস ৩৫ টাকা চাওয়া হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই আনসার ও এপিবিএন সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন নওশাদ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দোকানিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য উদ্যোগ
৩ ডিসেম্বর হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের চলাচলের পথে থাকা বাধা অপসারণ করে তালা খুলে দেন তিনি। ঘোষণা দেন—বিদেশ থেকে আগত হুইলচেয়ার যাত্রীরা প্রয়োজনে ক্যানোপি-২ বা এক্সিট গেট-২ দিয়ে সরাসরি অপেক্ষমাণ গাড়ি পর্যন্ত যেতে পারবেন।
শৌচাগার থেকে লাগেজ—সবখানে নজরদারি
১০ ডিসেম্বর পচা সমুচা বিক্রির দায়ে একটি দোকানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা।
১১ ডিসেম্বর শৌচাগারে বকশিশ আদায়ের অভিযোগ পেয়ে গভীর রাতে সব শৌচাগার পরিদর্শন করেন। ঘোষণা দেন—এখন থেকে ক্লিনাররা সর্বোচ্চ ১০০ টাকা রাখতে পারবেন।
একই দিনে নির্ধারিত স্থানে টিস্যু না রাখার দায়ে ডিউটি বাতিল ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা।

লাগেজ চুরি রোধে বডি ক্যামেরা
১৫ ডিসেম্বর লাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের পর জানান, বাংলাদেশ বিমান লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে লাগেজ কাটা বা চুরি শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব হবে। কোনো অনিয়ম হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বডি ক্যামেরা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কৃতিত্ব এককভাবে তার নামে প্রচার হওয়ায় তিনি নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করেন। ফেসবুকে লেখেন—এটি রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনা ও বাংলাদেশ বিমান এবং বেবিচকের সম্মিলিত উদ্যোগের ফল।
যাত্রীদের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা
তার পোস্টের নিচে যাত্রীদের মন্তব্যই বলে দেয় প্রভাব কতটা গভীর।
একজন লেখেন, “প্রবাসীরা যুগ যুগ ধরে আপনার দায়িত্ব স্মরণ রাখবে।”
আরেকজন বলেন, “আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রোল মডেল তৈরি করেছেন।”
নওশাদের ভাষায়
“আমি বিমানবন্দরে যোগদানের পর থেকে রুটিন অনুযায়ী আমার কাজটাই করছি। অন্য ম্যাজিস্ট্রেটরাও সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। ফেসবুকে অভিযানগুলো প্রচার করায় যাত্রীদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। যতদিন এখানে থাকব, দায়িত্ব গুরুত্ব দিয়েই পালন করব।”
বিমানবন্দরে এই পরিবর্তন প্রমাণ করে—দায়িত্বশীলতা, তৎপরতা আর সদিচ্ছা থাকলে ব্যবস্থার চিত্র বদলানো সম্ভব। আর সেই পরিবর্তনের সাক্ষী এখন হাজারো দেশি-বিদেশি যাত্রী।

