রংপুর নগরের একটি নির্মাণাধীন ভবনে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী।
শনিবার গভীর রাতে মাছুয়াপাড়া এলাকার ওই বাড়ি থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ ছিল এবং কারা এতে জড়িত—এখনো তার কোনো নিশ্চিত উত্তর দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবারটির বাড়িটি ছিল নির্মাণাধীন একটি তিনতলা ভবন। তারা সেখানে দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির ভেতরে পড়ে থাকায় মরদেহগুলোতে পচন ধরেছিল। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত বিষয়টি স্বজনদের নজরে আসে।
স্বজনের ফোনে সন্দেহ, এরপর বাড়িতে গিয়ে ভয়াবহ দৃশ্য
পুলিশের ধারণা, বৃহস্পতিবার গভীর রাতেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। তবে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে প্রায় দুই দিন পর।
প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে বড় বোন ও ভাগনির সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। রাতের দিকে আবার বোনের নম্বর থেকে একটি কল এলেও তিনি সেটি ধরতে পারেননি। এরপর আর পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
শনিবার বিকেল থেকে বারবার ফোন করেও কাউকে না পেয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পূজা। একপর্যায়ে রাতে তিনি বোনের বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, প্রধান ফটকে তালা দেওয়া। কয়েকবার কলিং বেল বাজিয়েও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
পাশের ভবনের দিক দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে ভেতরে তাকালে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান তিনি। তখনই তাঁর আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে সদস্যরা ভবনের ভেতর থেকে একে একে চারটি মরদেহ উদ্ধার করেন।
একই বাড়িতে, ভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায় চারজনের মরদেহ
ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, বাড়ির বিভিন্ন অংশে জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকটি আলমারি ও ড্রয়ার খোলা ছিল। তবে সেগুলো ভাঙার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে খাটের পাশে পাওয়া যায় আয়ুশের মরদেহ। তাঁর গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল।
সিঁড়ির কাছে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও তাঁর মেয়ে আগামীকে। তাঁদের গলায় দড়ি ছিল। আর ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ। তাঁর গলায় প্যাঁচানো ছিল একটি গামছা।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের মুখেও কিছুটা ঝলসানোর চিহ্ন পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার আগে বা পরে মুখে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

ডাকাতি, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
ঘরের অবস্থা দেখে প্রথমদিকে ডাকাতির বিষয়টি সামনে আসে। কারণ, আলমারি ও ড্রয়ার খোলা এবং ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া গেছে।
তবে ঘটনাটিকে শুধুই ডাকাতি হিসেবে দেখছে না পুলিশ। কারণ, বাড়িতে থাকা টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও মুঠোফোনের মতো মূল্যবান সামগ্রী নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে কোনো আলমারি বা ড্রয়ার জোর করে ভাঙার চিহ্নও নেই।
পুলিশ বলছে, হত্যাকারীরা চাবি ব্যবহার করে আলমারি ও ড্রয়ার খুলে থাকতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি চাবির গোছাও পাওয়া গেছে। সেখানে নগদ অর্থ বা মূল্যবান গয়না ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
রংপুর সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, একাধিক বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। হত্যাকারীরা দীর্ঘ সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থান করেছিল কি না, কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সেখানে প্রবেশ করে পরে চারজনকে হত্যা করেছে কি না—দুই দিকই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেশীদের কাছেও ছিল না কোনো ধারণা
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জনবহুল এলাকায় ঘটনাটি ঘটলেও আশপাশের কেউ কোনো চিৎকার বা অস্বাভাবিক শব্দের কথা জানাতে পারেননি।
নিহত পরিবারের পাশের ভবনে বসবাসকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক জানান, তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিছুই বুঝতে পারেননি। অন্য এক প্রতিবেশী জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারও বিরোধ থাকার কথাও তাঁর জানা ছিল না।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলেও আয়ুশকে বাইরে খেলতে দেখা গিয়েছিল। একই দিন সন্ধ্যার আগে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রীকেও হাঁটতে দেখা যায়। এরপর কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য পাওয়া যায়নি।
আগামীর এক সহপাঠীও ঘটনাটি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর ভাষ্য, আগামী ছিলেন বন্ধুবৎসল ও শান্ত স্বভাবের। পরিবারের চার সদস্যকে কেন এমনভাবে হত্যা করা হলো, সেটিই এখন সবার কাছে বড় প্রশ্ন।
অবসর জীবনে চিকিৎসাও দিতেন গণপতি
গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়। দীর্ঘদিন রংপুর জিলা স্কুলে হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তিনি অবসরে যান।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কেনার পর কয়েক বছর আগে নিজের বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন তিনি। ভবনটির কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও পরিবার নিয়ে দ্বিতীয় তলায় বসবাস করছিলেন।
অবসরের পর গণপতি হোমিও চিকিৎসাও দিতেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। পরিবারের সদস্যদের কারও সঙ্গে বিরোধ বা শত্রুতার কথা তাঁরা জানতেন না।
তদন্তে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
চারটি মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সময়, ব্যবহৃত পদ্ধতি, বাড়িতে প্রবেশের পথ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না—সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের সামনে এখন মূলত কয়েকটি প্রশ্ন—কেন একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হলো, হত্যাকারীরা কীভাবে বাড়িতে ঢুকল, তারা কতক্ষণ সেখানে ছিল এবং হত্যার পর কীভাবে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে গেল?
এখনো এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি। কোনো মামলা না হলেও তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ ও সিআইডি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই এখন তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য।

