বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগ থেকেই চীনের ৩৭ বছর বয়সী ওয়াং ঝুয়াং জীবনসঙ্গীর সন্ধান শুরু করেছিলেন। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও উপযুক্ত কাউকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি একটি ঘটক এজেন্সির বিজ্ঞাপনে আশ্বস্ত হন।
বিজ্ঞাপনগুলোতে প্রতিশ্রুতি ছিল, দীর্ঘদিন ডেটিং বা সম্পর্কের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। এজেন্সি সরাসরি এমন নারীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে, যাঁরা শান্ত স্বভাবের, সংসারী এবং বিয়েতে আগ্রহী।
ওয়াংয়ের ভাষ্য, গুইঝৌ প্রদেশের নারীদের সম্পর্কে এজেন্সি তাঁকে বিশেষভাবে আশ্বস্ত করেছিল। বলা হয়েছিল, তাঁরা মিতব্যয়ী, সংসার সামলাতে জানেন এবং বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংসার করতে চান।
এই আশ্বাসেই ওয়াং হেবেই প্রদেশ থেকে গুইঝৌয়ের রাজধানী গুইয়াংয়ে যান।
প্রথম দিকে তাঁর মনে হয়েছিল, সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।
এজেন্সি একের পর এক নারীকে তাঁর সঙ্গে দেখা করায়। কয়েক দিনের মধ্যেই সাতজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। প্রত্যেকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তাঁদের বাড়ি কোথায়, আগে বিয়ে হয়েছিল কি না কিংবা সন্তান আছে কি না।
অষ্টম নারীটির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ওয়াং মনে করেন, এবার হয়তো তাঁর অনুসন্ধান শেষ হয়েছে।
‘তিনি খুব সাধারণ পোশাক পরেছিলেন। তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি অন্তর্মুখী এবং সৎ,’ বলেন ওয়াং।
কিন্তু সম্পর্কটি সম্পর্কে জানার সুযোগ তাঁর খুব বেশি ছিল না। বিয়ের আগে চার-পাঁচবার দেখা হলেও প্রতিবার কথা বলার সময় ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ মিনিট। ওয়াংয়ের দাবি, এজেন্সি তাঁদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর বা যোগাযোগের তথ্য বিনিময় করতে নিষেধ করেছিল। নিয়ম ভাঙলে জরিমানার কথাও বলা হয়েছিল।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াং বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর শুরু হয় বিপুল খরচ।
বধূমূল্য, বিয়ের অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে তাঁর হিসাবে মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ ইউয়ান। এর মধ্যে শুধু বধূমূল্যই ছিল ৩ লাখ ইউয়ানের বেশি।
কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরই পরিস্থিতি বদলে যায়।
একদিনের পর একদিন ঋণ আদায়কারীদের ফোন আসতে থাকে। তাঁরা জানাতে থাকেন, ওয়াংয়ের স্ত্রী তাঁদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন।
এরপর স্ত্রীর অতীত সম্পর্কে খোঁজ শুরু করেন ওয়াং। তাঁর ফোনে তিনি এমন কিছু নথি পান, যা তাঁর কাছে পুরো বিষয়টিকে নতুন করে সন্দেহজনক করে তোলে। সেখানে আগের বিয়ে, জন্মনিবন্ধনসহ তাঁর জীবনের এমন তথ্য পাওয়া যায়, যা ওয়াংকে বিয়ের আগে জানানো হয়নি।
ওয়াং পরে জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী আগে আরও তিনবার বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁর তিনটি সন্তান রয়েছে। তিনি কারাওকে বারে হোস্টেস হিসেবেও কাজ করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল ঋণের দায় থাকার পাশাপাশি গুরুতর যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্যও ওয়াং জানতে পারেন।
এমনকি নিজের বয়স নিয়েও তিনি সত্য বলেননি বলে ওয়াংয়ের দাবি।
সবকিছু জানার পর ওয়াং স্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা চান। জবাবে স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের কথা বলেন। তবে বিয়ের সময় দেওয়া বধূমূল্যের অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই বলেও জানিয়ে দেন।
ওয়াংয়ের ভাষায়, ‘আমার পুরো পরিবারই বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে গেছে।’
ঘটনাটি এক বছরের বেশি সময় আগে ঘটলেও এর প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
‘আমার মা–বাবা এ জন্য আমাকে দোষারোপ করেন। আমি অনিদ্রা ও উদ্বেগে ভুগছি। কাজে মনোযোগ দিতে পারি না,’ বলেন ওয়াং।

ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পেছনে বড় সামাজিক সংকট
ওয়াংয়ের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চীনের দীর্ঘদিনের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা দেশটির বিয়ের বাজারেও বড় পরিবর্তন এনেছে।
দশকের পর দশক চীনে এক সন্তান নীতি চালু ছিল। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার সেই নীতি পরিবর্তন করে। কিন্তু তত দিনে ছেলে সন্তানের প্রতি সামাজিক পক্ষপাত এবং দীর্ঘদিনের এক সন্তান নীতির প্রভাবে নারী ও পুরুষের সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে।
বর্তমানে দেশটিতে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি বেশি।
ফলে বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকার পুরুষদের জন্য বিয়ে করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বয়স ৩০-এর শেষ দিকে পৌঁছানো, আর্থিকভাবে মধ্যম অবস্থানে থাকা এবং পছন্দের পাত্রী পাওয়ার সুযোগ কম—এমন পুরুষদের পরিস্থিতি আরও কঠিন।
ওয়াং বলেন, তাঁর এলাকায় একজন পুরুষকে বিয়ের জন্য গাড়ি ও বাড়ির মালিক হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় পারিবারিক ব্যবসাও থাকতে হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে ‘বধূমূল্য’ দেওয়ার চাপ।
চীনের অনেক অঞ্চলে বিয়ের সময় বরের পরিবারকে কনের পরিবারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। যেখানে পুরুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে উপযুক্ত পাত্রী পাওয়ার প্রতিযোগিতা এই অর্থের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফলে বিয়ের জন্য আর্থিকভাবে প্রস্তুত থাকা অনেক পুরুষ দ্রুত সমাধানের আশায় ঘটক এজেন্সির দ্বারস্থ হচ্ছেন।
‘তিন দিনে’ বিয়ের প্রতিশ্রুতি
গুইঝৌয়ের গুইয়াং শহর এখন এ ধরনের দ্রুত বিয়ের বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
শহরের বিভিন্ন শপিং এলাকা ও বহুতল ভবনে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘটক এজেন্সি। তাদের বিজ্ঞাপনে এমন বার্তা দেওয়া হয়—সঠিক মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে সাধারণ ডেটিংয়ের কয়েক বছরের সময় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এ ধরনের সেবা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যবসা দ্রুত বেড়েছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা, অবৈধ কার্যক্রম এবং বিশৃঙ্খলার অভিযোগও বাড়ছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ম্যাচমেকিং বা পাত্রপাত্রী পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ঘটনায় ১ হাজার ৫৪৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলেছে।
সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ার পর পাঁচটি সরকারি সংস্থা যৌথভাবে দেশজুড়ে ঘটক শিল্পের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে।
একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, একটি এজেন্সি কারাওকে বারের নারী কর্মীদের সম্ভাব্য পাত্রী হিসেবে ব্যবহার করে ১২৮ জন পুরুষের কাছ থেকে ২৫ লাখ ইউয়ানের বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।
বেইজিংয়ের আইনজীবী ফান বিংহে মনে করেন, ‘ফ্ল্যাশ ম্যারেজ’ভিত্তিক প্রতারণা বন্ধ করতে এই খাতের জন্য আরও নির্দিষ্ট সরকারি বিধিনিষেধ প্রয়োজন হতে পারে।
এজেন্সির সাজানো বিয়ে
ওয়াংয়ের ক্ষেত্রেও এজেন্সিটি শুধু পাত্রী খুঁজে দেওয়ার কথা বলেনি। বরং সম্ভাব্য নারীদের পরিচয় যাচাই এবং প্রতারণার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছিল।
এই কারণেই নিজের সঞ্চয়ের বড় অংশ তাদের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেননি তিনি।
বিয়ের পর এজেন্সি নবদম্পতির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ব্যবসার প্রচারে ব্যবহার করে। ভিডিওতে দেখা যায়, লালগালিচার ওপর নবদম্পতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসছেন, হাত ধরে আছেন; পেছনে বাজছে রোমান্টিক সংগীত।
বাইরে থেকে সবকিছু ছিল আদর্শ বিয়ের মতো।
কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত পাল্টে যায়।
ওয়াং যখন এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান চাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন দেখেন তাদের অফিসই আর নেই।
কেন প্রতারণার বিচার কঠিন?
আইনজীবী ফান বিংহের মতে, এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথও সহজ নয়।
কারণ, চীনের আইনে বিয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের বিধান নেই। তাই প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিয়ের শুরু থেকেই অর্থ নেওয়ার উদ্দেশ্যে সম্পর্কটি তৈরি করেছিলেন।
এখানেই তৈরি হয় বড় আইনি জটিলতা।
অভিযুক্ত ব্যক্তি সহজেই বলতে পারেন, তিনি সত্যিই বিয়ে করে সংসার করতে চেয়েছিলেন; পরে দাম্পত্য কলহ বা মতবিরোধের কারণে সম্পর্ক ভেঙে গেছে।
ফলে একটি পরিকল্পিত প্রতারণা আর ব্যর্থ দাম্পত্যের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদের সতর্ক করছেন ওয়াং
নিজের ক্ষতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন ওয়াং অন্য পুরুষদের সতর্ক করার চেষ্টা করছেন।
গুইয়াংয়ে ভাড়া করা একটি ফ্ল্যাটে বসে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরি করেন। সেখানে ঘটক এজেন্সির মাধ্যমে বিয়ে করার আগে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত, তা তুলে ধরেন।
তাঁর কাছে প্রায়ই এমন পুরুষেরা আসেন, যাঁরা নিজেরাও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কেউ এজেন্সির মালিককে খুঁজছেন, কেউ আবার বিয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্ত্রী চলে যাওয়ার পর নিজের অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
গুইয়াংয়ের একটি ঘটক এজেন্সির মালিক বিবিসিকে বলেন, ফ্ল্যাশ ম্যারেজের বাজার মূলত গত দুই-তিন বছরে দ্রুত বড় হয়েছে।
এজেন্সিগুলোর দাবি, গুইঝৌয়ের কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবারগুলো এক সন্তান নীতি পুরোপুরি মেনে চলেনি। অনেক পরিবার ছেলে সন্তানের আশায় একাধিক সন্তান নিয়েছে। ফলে কিছু অঞ্চলে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
এখন সেই নারীদের মধ্য ও পূর্ব চীনের এমন পুরুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাঁদের নিজেদের এলাকায় উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া কঠিন।
এজেন্সিগুলোর ভাষ্য, গ্রাহকের পছন্দের স্বাধীনতা রয়েছে এবং তাঁদের কাজ শুধু উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে দিতে সাহায্য করা।
কিন্তু ওয়াংয়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কয়েক মিনিটের পরিচয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে করা একটি বিয়ে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তিনি এখন নিজের হারানো অর্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় চেষ্টা সম্ভবত অন্য পুরুষদের একই ভুল থেকে বাঁচানো।
কারণ, যে মানুষটি একসময় মনে করেছিলেন অবশেষে তিনি তাঁর জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছেন, সেই মানুষটিই এখন অন্যদের সতর্ক করছেন—বিয়ের প্রতিশ্রুতি যত আকর্ষণীয়ই হোক, অপরিচিত কারও ওপর জীবনভর সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার আগে সত্যতা যাচাই করা কতটা জরুরি।

