ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে একাধিক সতর্কবার্তা ছিল। যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারা তাঁকে যে ঝুঁকিগুলোর কথা জানিয়েছিলেন, পরবর্তী ছয় মাসের ঘটনাপ্রবাহে তার অনেকগুলোই বাস্তবে দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ওভাল অফিসে তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। মূল আলোচনার বিষয় ছিল—ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক জ্যেষ্ঠ সহকারী এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মনে করছিলেন, সামরিক পদক্ষেপের জন্য এটাই উপযুক্ত সময়। তাঁদের যুক্তি ছিল, ইরান কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামোয় বড় আঘাত হানার পাশাপাশি তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের সামনে তখন আরেকটি রাজনৈতিক হিসাবও ছিল। তিনি নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে পারলে সেটি তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করবে—এমন প্রত্যাশাও ছিল।
কিন্তু গোয়েন্দা বিশ্লেষণে পরিস্থিতির অন্য একটি চিত্র উঠে আসে।
গ্যাবার্ডের সতর্কতা ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের বদলে উল্টো ফল হতে পারে। আরও কট্টরপন্থী একটি গোষ্ঠী ক্ষমতায় এসে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি সরবরাহপথ কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।
এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল না। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলার ঝুঁকিও ছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারত।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ বাড়তে থাকলে প্রাণহানি ও অস্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, গোলাবারুদের মজুত এবং সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
শেষ পর্যন্ত এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও ট্রাম্প সামরিক পথেই এগিয়ে যান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু হয়। একই সময়ে তিনি ইরানের জনগণকে তাঁদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান।
প্রথমদিকে ট্রাম্পের প্রত্যাশা ছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু সেই হিসাব মেলেনি। ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের বদলে সংঘাত এখন প্রায় ছয় মাস ধরে চলছে এবং এর শেষ কোথায়, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
সরকার বদলের লক্ষ্যও পূরণ হয়নি
যুদ্ধের শুরুতে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল, সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনও দেশটির ক্ষমতার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরানি সরকারও এখন পর্যন্ত আত্মসমর্পণ বা বড় ধরনের রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি।
ফলে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলে দেওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ওয়াশিংটনকে নতুন কৌশল খুঁজতে হচ্ছে।

সামরিক সাফল্যের মূল্যও বড়
যুদ্ধের সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রায় তিন হাজার ইরানি নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১৮ জন মার্কিন সেনা মারা গেছেন। আরও ৭৫৬ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে পেন্টাগনের তথ্য।
মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর চাপ পড়েছে। একই সঙ্গে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ রিপাবলিকানদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হারও তাঁর বর্তমান প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সবচেয়ে নিচু পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যে চুক্তির আশা ছিল, সেটিও টেকেনি
ট্রাম্পের লক্ষ্য শুধু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নয়। তিনি এমন একটি সমঝোতা চান, যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের জন্য ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। একই সঙ্গে তিনি চান, যুদ্ধের শেষটা তাঁর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলেছে।
১৭ জুন একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিছুদিনের মধ্যেই সেই সমঝোতাও ভেঙে পড়ার পথে যায়। তেহরান আবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করলে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। তাঁর কাছে এটি ছিল চুক্তির প্রতি বিশ্বাসভঙ্গের শামিল।
এরপর ১৭ আগস্ট পারমাণবিক আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়। কূটনৈতিক সমাধানের বদলে আবারও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন।
নতুন অস্ত্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
১৯ আগস্ট অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। লক্ষ্য—নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে দুর্বল করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেওয়া।
অর্থাৎ সামরিক অভিযান শুরুর ছয় মাস পর যুক্তরাষ্ট্র আবার এমন একটি কৌশলের দিকে ফিরেছে, যার মূল লক্ষ্য ইরানের শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ট্রাম্প তাঁর কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারবেন কি না। কারণ সামরিক হামলা ইরানের সরকারকে সরাতে পারেনি, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করেছে এবং কূটনৈতিক উদ্যোগও স্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প যে দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা করেছিলেন, ছয় মাস পর সেই প্রত্যাশা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। ইরান এখনও টিকে আছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট পুরোপুরি কাটেনি এবং পারমাণবিক ইস্যুতেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু যুদ্ধ শেষ করা নয়—বরং এমনভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানো, যাতে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হিসেবে দেখা না হয় এবং একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যের দাবিটিও টিকিয়ে রাখা যায়।

